বড়াইগ্রামের ধানাইদহে ৭১’র ১১ এপ্রিলে ঘটে নারকীয় হত্যাকান্ড ও প্রতিরোধ যুদ্ধ

বড়াইগ্রাম (নাটোর) নিজস্ব প্রতিবেদক, তারিখ ঃ ১০/০৪/২৬ খ্রিঃ

৭১’র ১১ এপ্রিলে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার ধানাইদহে সংঘটিত হয়েছিল নারকীয় হত্যাকান্ড ও জেলার বৃহত্তম পাক-হানাদারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ। এতে শহীদ হয়েছিলেন প্রায় ৮০ জন, বুলেটে আহত হয়েছিলেন শতাধিক মানুষ। পুড়ানো হয়েছিল ৫ শতাধিক ঘর-বাড়ি। জন শূন্য বাড়িগুলো ২/৩ দিন যাবত আগুনে পুড়েছিল আপন গতিতে।

যুদ্ধে নারকীয় হত্যাকান্ডের সাক্ষী পারকোল ও ধানাইদহের গণকবর। যুদ্ধের পরদিন ১২ এপ্রিল বিকেলে তড়িঘড়ি করে পারকোল গ্রামে একটি পুকুরের পাশে থাকা খাদে কাফন, জানাজা ছাড়াই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটি চাপা দেয়া হয় ১৭ জনকে। তারা হলেন ছবির উদ্দিন সরকার, শুকুর আলী, মাজেদ আলী, জাহাঙ্গীর আলম, সাজেদার মোল্লা, আবু তালেব, জান মোহাম্মদ, ইলিম সাহা, আছের উদ্দিন, বাগুনী বিবি, গোলাপী বিবি, জোসনা বিবি, জালেমা খাতুন, আদুরী বিবি, জহুরা খাতুন, আছিয়া খাতুন ও আনজেরা খাতুন।
ধানাইদহের গণকবরে ৭ জন প্রতিরোধ যোদ্ধার নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে। তারা হলেন অজ্ঞাতনামা দুই ইপিআর, দুই জন আনসার সদস্য মহব্বত আলী ও সিরাজুল ইসলাম, সহযোদ্ধা তিনজন দুলাল, বিল্টু ও শাহজাহান। তারা কয়েন গ্রামের বাঁশ ঝাড়ের বাঙ্কারে ভারী অস্ত্র সেট করে যুদ্ধ করতেছিলেন। পাকবাহিনী তাদের আটকের পর বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে হত্যা করে ধানাইদহ ব্রীজের দক্ষিণ প্রান্তে নদীর কিনারায় ফেলে দেয়। ১৯৯৮ সালে পারকোল ও ধানাইদহ গণকবর নির্মাণ করা হয়েছে।

গণকবর ছাড়াও ওই যুদ্ধে পাকবাহিনীর গুলিতে মারা যান পারকোল গ্রামের মনোরঞ্জন শীল, জয়না বিবি, বৈষ্টমি, পারগোপালপুর গ্রামের লছের উদ্দিন, ইছারুদ্দিন, আঃ রাজ্জাক, পাঁচবাড়ীয়া গ্রামের জামাত আলী, আঃ রহমান, শাহাচাঁদ, জাগদ্দীন, রহিমুদ্দিন, খেযালা, আছাতন বিবি, ধানাইদহ গ্রামের আজাহার মালিথা,জফির উদ্দিন, মজনু, আনজেরা, কালাচাঁদ,রমজান আলী, কেরামত আলী, রাশেদা বিবি, হালিমা খাতুন, আত্তাব আলী, লবিন প্রাং, আব্দুল হক, মহির উদ্দিন, বাহাতন বিবি, নছিম উদ্দিন। এছাড়াও কিছু নাম অজানা রয়েছে।

এ প্রতিরোধ যুদ্ধের সহযোদ্ধা, সরদার মো. বয়েত রেজা, মোজাহার আলী (পরবর্তীতে) বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং গুলিবিদ্ধ আহত পারকোল গ্রামের ওসমান আলী সরকার গত ৮ এপ্রিল এসব কথা বলেন। তারা আরও জানান, আরিচা- নগরবাড়ি ঘাট হয়ে পাকবাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে তৎকালীন মেজর আব্দুর রশিদ ও ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামানের নের্তৃত্বে ধানাইদহে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয় ৭১’র ৯ এপ্রিল সকাল থেকেই।

পরদিন ১০ এপ্রিল রাতে জীপ ও ট্রাকযোগে ৪০ জন ইপিআর ও আনসার যুদ্ধের অস্ত্র সহ পাঁচবাড়ীয়া হাইস্কুল মাঠে এসে খলিশাডাঙ্গা নদীর তীরে ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে বাঙ্কার তৈরী করেন এবং পাকবাহিনী ১১ এপ্রিল দুপুর ১২টায় পাবনার দিক থেকে গড়মাটি মুচিপাড়া এলাকায় পৌছলে ইপিয়ার ও পাকবাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। পাকবাহিনী সন্মুখ যুদ্ধে ইপিআর বাহিনীর প্রতিরোধ বেষ্টনী ভাঙ্গতে ব্যর্থ হয়ে রাত ৮টার দিকে একটি দল মহাসড়কের উত্তর পাশ দিয়ে পারকোল, পাঁচবাড়ীয়া, মহেশপুর গ্রামে, দ্বিতীয় দলটি মহাসড়কের দক্ষিণ পাশ দিয়ে ধানাইদহ গ্রামে প্রবেশ করে বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং গণহত্যা চালায়।

মো. আশরাফুল ইসলাম (এমবিএ-মার্কেটিং)
মোবা: ০১৭২৮-০৩৩৫৫২