আবরার নুর ফাহিম স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলার ঐতিহ্যবাহী ও অর্থকরী ফসলের মধ্যে পাট অন্যতম। একসময় “সোনালি আঁশ” নামে পরিচিত এই ফসল দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখত। এখনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা পাট চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বীজ বপন থেকে শুরু করে আঁশ সংগ্রহ পর্যন্ত পাট চাষে কৃষকদের দীর্ঘ সময় ও পরিশ্রম ব্যয় করতে হয়।পাট চাষের জন্য সাধারণত উর্বর ও দোআঁশ মাটি নির্বাচন করা হয়। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। এরপর উন্নত জাতের পাটের বীজ বপন করা হয়। বীজ বপনের কয়েক দিনের মধ্যেই জমিতে ছোট ছোট চারা গজাতে শুরু করে।চারা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরা জমির আগাছা পরিষ্কার করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সার ও সেচ প্রদান করেন। পাটগাছ যখন কিছুটা বড় হয়, তখন এর পাতাগুলো শাক হিসেবে খাওয়া যায়। গ্রামাঞ্চলে পাটশাক অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই শাক অনেকেরই পছন্দের খাদ্য।বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে পাটগাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে। বর্ষা মৌসুমে গাছগুলো ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। সাধারণত বীজ বপনের ১২০ থেকে ১৩০ দিনের মধ্যে পাট কাটার উপযোগী হয়।পাট কাটার সময় কৃষকরা গাছগুলো গোড়া থেকে কেটে আঁটি বেঁধে রাখেন। এরপর আঁশের গুণগত মান ভালো করার জন্য পাটের আঁটিগুলো পুকুর, খাল, বিল বা জলাবদ্ধ স্থানে ডুবিয়ে রাখা হয়। এ প্রক্রিয়াকে স্থানীয় ভাষায় ‘জাগ দেওয়া’ বলা হয়। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ দিন পানির নিচে রাখার পর গাছের ছাল নরম হয়ে আসে।এরপর কৃষকরা পানিতে নেমে একে একে পাটের আঁশ ছাড়িয়ে নেন। আঁশ সংগ্রহের পর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। শুকিয়ে গেলে আঁশ বাজারে বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়। অন্যদিকে পাটের কাঠি জ্বালানি, বেড়া নির্মাণ এবং বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।কৃষকদের মতে, পাট চাষে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে তারা আরও বেশি পাট চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।পাট শুধু একটি ফসল নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বীজ বপন থেকে শুরু করে পুকুরে জাগ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সোনালি আঁশ সংগ্রহ—প্রতিটি ধাপই কৃষকের কঠোর পরিশ্রম ও জীবনের গল্প বহন করে।